শিক্ষা

শিক্ষা ব্যবস্থা এতোটাই পঁচে গেছে, শুধু কমিশন দিয়ে সমাধান হবে না”: পরিকল্পনা উপদেষ্টা

দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার গভীর সংকট নিয়ে এক বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের পরিকল্পনা উপদেষ্টা, বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. হোসেন জিল্লুর রহমান। তিনি বলেছেন, দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা “এতোটাই পঁচে গেছে” যে, শুধুমাত্র বেতন কমিশন বা অন্য কোনো কমিশন গঠন করে এর সমাধান করা সম্ভব নয়। এই গভীর সংকট থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন জাতীয় ঐকমত্য এবং সুনির্দিষ্ট কার্যকরী পদক্ষেপ

মঙ্গলবার (২৮ অক্টোবর) ১০ম জাতীয় বেতন কমিশনের সাথে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিভিন্ন সংগঠনের বৈঠকের এক ফাঁকে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে এই কঠোর মূল্যায়ন তুলে ধরেন।

কেন এই কঠোর মূল্যায়ন? (“এতোটাই পঁচে গেছে”)

ড. হোসেন জিল্লুর রহমান তার মন্তব্যে কোনো রাখঢাক করেননি। তার এই চরম হতাশাব্যঞ্জক উক্তিটি দেশের শিক্ষা খাতের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত সমস্যাগুলোকেই নির্দেশ করে:

  • মানের সংকট: প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত শিক্ষার গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন দীর্ঘদিনের। মুখস্থ-নির্ভরতা, সৃজনশীলতার অভাব, প্রায়োগিক শিক্ষার ঘাটতি প্রকট।
  • অবকাঠামোগত দুর্বলতা: অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় শ্রেণিকক্ষ, ল্যাব, লাইব্রেরি বা স্যানিটেশনের সুব্যবস্থা নেই।
  • শিক্ষক সংকট ও মান: যোগ্য ও প্রশিক্ষিত শিক্ষকের অভাব, শিক্ষকদের বেতন-ভাতার বৈষম্য, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাব – এই সমস্যাগুলো বিদ্যমান।
  • কারিকুলাম ও আধুনিকায়ন: দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে শিক্ষা কারিকুলামকে যুগোপযোগী করার ক্ষেত্রে ধীরগতি।
  • দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা: শিক্ষা খাতের বিভিন্ন স্তরে দুর্নীতি ও প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনার অভিযোগও প্রায়শই ওঠে।

পরিকল্পনা উপদেষ্টার “পঁচে গেছে” উক্তিটি মূলত এই সামগ্রিক অবক্ষয়কেই নির্দেশ করছে।

শুধু কমিশন নয়, প্রয়োজন জাতীয় ঐকমত্য ও পদক্ষেপ

ড. রহমান স্পষ্ট করে বলেছেন, সমস্যা এতটাই গভীরে যে, কেবল একটি কমিশন গঠন করে রিপোর্ট তৈরি করলেই এর সমাধান হবে না। তিনি মনে করেন:

  • কমিশনের সীমাবদ্ধতা: অতীতে শিক্ষা নিয়ে অনেক কমিশন গঠিত হয়েছে, অনেক সুপারিশও এসেছে, কিন্তু তার পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন দেখা যায়নি। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা বা রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবে অনেক ভালো সুপারিশও ফাইলবন্দী হয়ে থাকে।
  • পরিকল্পনা কমিশনের সীমাবদ্ধতা: তিনি আরও উল্লেখ করেন, এই সমস্যার সমাধান একা পরিকল্পনা কমিশনের পক্ষেও করা সম্ভব নয়। এটি একটি জাতীয় সমস্যা, এর সমাধানও জাতীয়ভাবেই করতে হবে।
  • প্রয়োজন জাতীয় ঐকমত্য: দেশের ভবিষ্যৎ কোন পথে যাবে, শিক্ষা ব্যবস্থাকে কীভাবে ঢেলে সাজানো হবে—এই মৌলিক প্রশ্নগুলোতে একটি জাতীয় ঐকমত্য প্রয়োজন। সকল রাজনৈতিক দল, শিক্ষাবিদ, অভিভাবক, শিক্ষার্থীসহ সংশ্লিষ্ট সকলকে এক টেবিলে বসে সমাধানের পথ খুঁজতে হবে।
  • সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ: শুধু আলোচনা বা ঐকমত্য নয়, এর ভিত্তিতে সুনির্দিষ্ট, লক্ষ্যভিত্তিক এবং বাস্তবায়নযোগ্য পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে এবং তার কঠোর মনিটরিং নিশ্চিত করতে হবে।

শেষ কথা

অন্তর্বর্তী সরকারের একজন গুরুত্বপূর্ণ উপদেষ্টার কাছ থেকে শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে এমন কঠোর মূল্যায়ন নিঃসন্দেহে একটি অশনি সংকেত। এটি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, শিক্ষা খাতের সংস্কার এখন আর কোনো ঐচ্ছিক বিষয় নয়, এটি একটি জাতীয় জরুরি অবস্থা। ড. হোসেন জিল্লুর রহমানের আহ্বান অনুযায়ী, গতানুগতিক কমিশন-নির্ভরতা থেকে বেরিয়ে এসে, একটি জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে সাহসী ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণই পারে এই গভীর সংকট থেকে জাতিকে মুক্ত করতে এবং একটি শিক্ষিত ও দক্ষ ভবিষ্যৎ প্রজন্ম নিশ্চিত করতে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *