শিক্ষা

প্রযুক্তি-নির্ভর বিশ্বে টিকে থাকতে মানসম্মত শিক্ষার বিকল্প নেই: শিক্ষা উপদেষ্টার বিশেষ গুরুত্বারোপ

বর্তমান বিশ্ব দ্রুত পরিবর্তনশীল এবং প্রযুক্তি-নির্ভর। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), রোবোটিক্স এবং ডাটা সায়েন্সের এই যুগে প্রথাগত শিক্ষা ব্যবস্থার চেয়ে দক্ষতানির্ভর শিক্ষার গুরুত্ব বহুগুণ বেড়ে গেছে। সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. সি আর আবরার স্পষ্টভাবেই জানিয়েছেন যে, এই আধুনিক বিশ্বে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে মানসম্মত শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই।

উপদেষ্টার এই বক্তব্যের আলোকে আজকের বিশ্ববাজার এবং বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি বিশেষ বিশ্লেষণ নিচে তুলে ধরা হলো।

শুধু ডিগ্রি নয়, প্রয়োজন দক্ষতা (Skills over Degrees)

শিক্ষা উপদেষ্টা তার বক্তব্যে উল্লেখ করেছেন যে, বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার লক্ষ্য হওয়া উচিত দক্ষ, উদ্ভাবনী এবং প্রযুক্তি-সচেতন মানবসম্পদ গড়ে তোলা।

  • চতুর্থ শিল্প বিপ্লব: আমরা এখন চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের (4IR) মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। এখানে শুধু সার্টিফিকেট দিয়ে কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
  • প্রযুক্তিগত সক্ষমতা: শিক্ষার্থীদের এআই, অটোমেশন এবং ডাটা অ্যানালাইসিসের মতো বিষয়গুলোতে ন্যূনতম প্রাথমিক জ্ঞান থাকা আবশ্যক।

প্রযুক্তি-নির্ভর বিশ্বের চ্যালেঞ্জসমূহ

প্রযুক্তির এই জয়যাত্রায় টিকে থাকতে হলে শিক্ষার্থীদের কয়েকটি বিশেষ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে:

  • দ্রুত পরিবর্তনশীল কর্মক্ষেত্র: আজ যে পেশাটি জনপ্রিয়, পাঁচ বছর পর প্রযুক্তি সেটির রূপ বদলে দিতে পারে। তাই ক্রমাগত নতুন কিছু শেখার (Continuous Learning) মানসিকতা তৈরি করতে হবে।
  • বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা: এখন একজন শিক্ষার্থীকে শুধু দেশের ভেতরে নয়, বরং সারা বিশ্বের মেধার সাথে পাল্লা দিতে হয়।

মানসম্মত শিক্ষার মূল উপাদানসমূহ

শিক্ষা উপদেষ্টার মতে, মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে হলে শিক্ষাব্যবস্থায় নিচের পরিবর্তনগুলো জরুরি:

  1. গবেষণা ও উদ্ভাবন: বিদেশী প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব গবেষণা ও উদ্ভাবনের মাধ্যমে দেশকে স্বনির্ভর করতে হবে।
  2. শিক্ষক-শিক্ষার্থী-শিল্প খাতের সমন্বয়: শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সাথে শিল্প কারখানার (Industry-Academia Linkage) নিবিড় সম্পর্ক থাকতে হবে যাতে শিক্ষার্থীরা বাস্তব জীবনের সমস্যা সমাধান শিখতে পারে।
  3. নৈতিকতা ও মূল্যবোধ: প্রযুক্তির ব্যবহারের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের নৈতিক অবস্থানে থাকা এবং মানবিক মূল্যবোধ বজায় রাখা জরুরি।

সরকারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও শিক্ষা আইন

উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. সি আর আবরার জানিয়েছেন, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার শিক্ষা আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে। যদিও এর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন পরবর্তী নির্বাচিত সরকার করবে, তবে মানসম্মত শিক্ষার একটি শক্তিশালী ভিত্তি তারা তৈরি করে দিয়ে যেতে চান।

  • মেধা ও শ্রমের সঠিক ব্যবহার: দেশের তরুণ প্রজন্মের মেধা যেন বিদেশে পাচার না হয়ে দেশের কাজেই লাগে, সে লক্ষ্যে কর্মসংস্থানমুখী শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করা হচ্ছে।
  • স্বায়ত্তশাসন: প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোকে আরও কার্যকর করতে সেগুলোর স্বায়ত্তশাসনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

FAQ – সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী

প্রশ্ন ১: মানসম্মত শিক্ষা বলতে ঠিক কী বোঝায়? উত্তর: মানসম্মত শিক্ষা মানে শুধু পাঠ্যবই শেষ করা নয়, বরং জীবনোপযোগী দক্ষতা অর্জন, সৃজনশীল চিন্তা করতে শেখা এবং পরিবর্তনশীল প্রযুক্তির সাথে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সক্ষমতা অর্জন করা।

প্রশ্ন ২: প্রযুক্তি শিক্ষাকে কেন বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে? উত্তর: বর্তমানে কৃষি থেকে শুরু করে চিকিৎসা—সবক্ষেত্রেই প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে। প্রযুক্তি না জানলে একজন গ্র্যাজুয়েট আধুনিক কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করতে ব্যর্থ হবে, যা জাতীয় উন্নয়নের পথে বাধা।

প্রশ্ন ৩: নতুন শিক্ষা আইন সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য কী সুবিধা বয়ে আনবে? উত্তর: এই আইন বাস্তবায়িত হলে শিক্ষার মান নিয়ন্ত্রণ সহজ হবে, শিক্ষকদের মর্যাদা বাড়বে এবং শিক্ষার্থীদের অধিকার ও মেধার সঠিক মূল্যায়ন নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।


উপসংহার: আগামীর বাংলাদেশ

প্রযুক্তি-নির্ভর এই পৃথিবীতে টিকে থাকতে হলে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে বৈশ্বিক মানে উন্নীত করতে হবে। শিক্ষা উপদেষ্টার এই আহ্বান মূলত দেশের তরুণ প্রজন্মের প্রতি একটি শক্তিশালী বার্তা—নিজেকে দক্ষ করে গড়ে তুলুন, তবেই আগামীর বাংলাদেশ হবে সমৃদ্ধ ও স্বনির্ভর।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *