ভর্তি

লটারির বদলে ভর্তি পরীক্ষা চান শিক্ষকরা: মানের প্রশ্নে আপস নয়!

দেশের সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থী ভর্তির ক্ষেত্রে চালু হওয়া লটারি পদ্ধতি নিয়ে এবার জোরালো আপত্তি তুলেছেন খোদ শিক্ষকরাই। তারা মনে করছেন, এই পদ্ধতি মেধার সঠিক মূল্যায়ন করতে পারছে না এবং এর ফলে সামগ্রিকভাবে শিক্ষার মান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাই, লটারির পরিবর্তে আগের মতো ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থী মূল্যায়নের ভিত্তিতে ভর্তি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার দাবি জানিয়েছেন তারা।

“বাংলাদেশ সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতি (বাকেশিস)”-এর নেতারা শিক্ষা মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে এই দাবি তুলে ধরার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

কেন লটারির বিরোধিতা করছেন শিক্ষকরা?

শিক্ষকদের মতে, লটারি পদ্ধতির বেশ কিছু নেতিবাচক দিক রয়েছে যা শিক্ষার পরিবেশকে ব্যাহত করছে:

  1. মেধার অবমূল্যায়ন: লটারির মাধ্যমে অপেক্ষাকৃত কম মেধাবী শিক্ষার্থীরাও ভালো স্কুলগুলোতে ভর্তির সুযোগ পেয়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী ভালো প্রতিষ্ঠানে পড়ার সুযোগ হারাচ্ছে। এটি মেধার সঠিক মূল্যায়নকে বাধাগ্রস্ত করছে।
  2. শিক্ষার মান হ্রাস: বিভিন্ন মেধার শিক্ষার্থী একই ক্লাসে থাকায় শিক্ষকদের পক্ষে মানসম্মত পাঠদান কঠিন হয়ে পড়ছে। পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের প্রতি বিশেষ নজর দিতে গিয়ে অগ্রবর্তী শিক্ষার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে মনে করছেন তারা।
  3. শৃঙ্খলা ও ব্যবস্থাপনার চ্যালেঞ্জ: শিক্ষকরা বলছেন, মেধার ভিত্তিতে ভর্তি না হওয়ায় অনেক সময় শ্রেণিকক্ষে শৃঙ্খলা রক্ষা করা এবং পাঠ কার্যক্রমে শিক্ষার্থীদের সমানভাবে আগ্রহী রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
  4. কোচিং বাণিজ্য বন্ধ হয়নি: লটারি পদ্ধতি চালু করার অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য ছিল ভর্তি কোচিংয়ের দৌরাত্ম্য কমানো। কিন্তু শিক্ষকদের দাবি, কোচিং বাণিজ্য পুরোপুরি বন্ধ হয়নি, বরং ভিন্ন রূপে তা এখনো বিদ্যমান।

শিক্ষকদের প্রস্তাব: ভর্তি পরীক্ষায় ফেরা

বাকেশিস নেতারা বলছেন, শিক্ষার মান ধরে রাখতে এবং মেধার সঠিক মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে ভর্তি পরীক্ষার কোনো বিকল্প নেই। তারা বিশেষভাবে ষষ্ঠ ও নবম শ্রেণিতে ভর্তির ক্ষেত্রে অবশ্যই পরীক্ষা পদ্ধতি ফিরিয়ে আনার দাবি জানাচ্ছেন।

তাদের মতে, একটি প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে উত্তীর্ণ হয়ে আসা শিক্ষার্থীরা যেমন নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণ করে, তেমনি এটি শিক্ষকদের জন্যও পাঠদান ও শ্রেণিকক্ষ ব্যবস্থাপনা সহজ করে তোলে।

পরবর্তী পদক্ষেপ: সুপারিশমালা পেশ

শিক্ষক সমিতির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তারা খুব শীঘ্রই লটারি পদ্ধতির নেতিবাচক দিকগুলো এবং ভর্তি পরীক্ষার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে একটি সুপারিশমালা প্রস্তুত করবেন। এই সুপারিশমালা শিক্ষা মন্ত্রণালয়, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) এবং সংশ্লিষ্ট নীতি নির্ধারকদের কাছে পেশ করা হবে।

শেষ কথা

সরকারি স্কুলে ভর্তির ক্ষেত্রে লটারি পদ্ধতি চালু করা হয়েছিল মূলত কোচিং বাণিজ্য বন্ধ এবং ভর্তির সুযোগে সমতা আনার লক্ষ্যে। কিন্তু শিক্ষকরা এখন বলছেন, এই পদ্ধতি শিক্ষার মানের ক্ষেত্রে একটি বড় আপস হয়ে দাঁড়িয়েছে। মেধার মূল্যায়ন বনাম ভর্তির সমান সুযোগ—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করে একটি কার্যকর ও মানসম্মত ভর্তি প্রক্রিয়া কীভাবে নিশ্চিত করা যায়, তা নিয়ে এখন নীতি নির্ধারকদের নতুন করে ভাবতে হবে। শিক্ষকদের এই দাবি সেই আলোচনারই সূত্রপাত করলো।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *