বাংলাদেশ

তরুণ গবেষকদের উদ্ভাবনে আগ্রহী করা জরুরি”: প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস

স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণ এবং একবিংশ শতাব্দীর বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় দেশের গবেষণা ও উদ্ভাবন খাতের আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন। এই প্রেক্ষাপটেই, তরুণ গবেষকদের উদ্ভাবনী কাজে আগ্রহী করে তোলাকে “অত্যন্ত জরুরি” বলে মন্তব্য করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস।

সম্প্রতি এক সেমিনারে প্রধান অতিথির ভাষণে তিনি এই গুরুত্বপূর্ণ দিকটি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, একটি দেশের প্রকৃত উন্নতি ও টেকসই ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার নিজস্ব জ্ঞান, গবেষণা ও উদ্ভাবনী শক্তির ওপর।

সেমিনারে প্রধান উপদেষ্টার মূল বার্তা

ড. ইউনূস তার বক্তব্যে দেশের গবেষণা খাতের বর্তমান অবস্থা এবং ভবিষ্যতের অপার সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, “আমাদের তরুণ গবেষকদের উদ্ভাবনে আগ্রহী করে তোলা অত্যন্ত জরুরি। দেশের গবেষণা ও উদ্ভাবন খাতকে বিশ্বমানে উন্নীত করতে হবে।”

তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, তরুণদের মধ্যে যে সুপ্ত প্রতিভা ও সম্ভাবনা রয়েছে, সেটিকে কাজে লাগানোর জন্য একটি সঠিক “ইকোসিস্টেম” বা অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে হবে।

উদ্ভাবন কেন এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি?

প্রধান উপদেষ্টার এই মন্তব্যটি এমন এক সময়ে এলো যখন বাংলাদেশ একটি বড় অর্থনৈতিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই মুহূর্তে উদ্ভাবনের ওপর জোর দেওয়ার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে:

  • চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের প্রস্তুতি: বিশ্ব এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), রোবটিক্স এবং ইন্টারনেট অফ থিংস (IoT)-এর যুগে প্রবেশ করছে। এই হাই-টেক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে নিজস্ব উদ্ভাবনের কোনো বিকল্প নেই।
  • অর্থনৈতিক বৈচিত্র্য: শুধু তৈরি পোশাক শিল্প বা রেমিট্যান্সের উপর নির্ভর করে দীর্ঘমেয়াদী টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে হলে উচ্চ প্রযুক্তির পণ্য ও সেবা তৈরির দিকে ঝুঁকতে হবে, যার মূলে রয়েছে গবেষণা।
  • মেধা পাচার (Brain Drain) রোধ: প্রতি বছর দেশের হাজার হাজার মেধাবী তরুণ উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার জন্য বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন এবং সেখানেই স্থায়ী হচ্ছেন। এর প্রধান কারণ হলো দেশে বিশ্বমানের গবেষণার পরিবেশ ও সুযোগের অভাব। দেশে যদি সেই পরিবেশ নিশ্চিত করা যায়, তবে এই “মেধা পাচার” রোধ করা সম্ভব।

কীভাবে তরুণ গবেষকরা আগ্রহী হবেন? (সমাধানের পথ)

ড. ইউনূসের এই আহ্বানকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে কিছু সুনির্দিষ্ট ও সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি বলে মনে করছেন শিক্ষাবিদ ও গবেষকরা। এর মধ্যে প্রধান বিষয়গুলো হলো:

১. গবেষণা খাতে বাজেট বৃদ্ধি: জাতীয় বাজেটে গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) খাতে বরাদ্দ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে হবে। শুধু বরাদ্দ দিলেই হবে না, সেই অর্থের সঠিক ও স্বচ্ছ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।

২. আধুনিক ল্যাব ও অবকাঠামো: বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নামে মাত্র নয়, বরং সত্যিকার অর্থে বিশ্বমানের ল্যাবরেটরি এবং গবেষণার সরঞ্জাম নিশ্চিত করতে হবে।

৩. শিল্প ও একাডেমির সমন্বয়: শিল্প খাতের চাহিদা কী, তা জেনে গবেষণার বিষয়বস্তু নির্ধারণ করতে হবে। একটি উদ্ভাবন যেন শুধু গবেষণাপত্রেই (Journal Paper) সীমাবদ্ধ না থেকে, তা যেন বাস্তব বাণিজ্যিক উৎপাদনে (Commercialization) যেতে পারে, সেই সেতু তৈরি করতে হবে।

৪. স্বীকৃতি ও প্রণোদনা: তরুণ গবেষকদের কাজের সঠিক মূল্যায়ন, স্বীকৃতি এবং আকর্ষণীয় আর্থিক প্রণোদনা (ফেলোশিপ/গ্রান্ট) প্রদান করতে হবে, যাতে তারা সম্পূর্ণ মনোনিবেশ করে গবেষণায় আত্মনিয়োগ করতে পারেন।

শেষ কথা

প্রধান উপদেষ্টার এই বক্তব্য দেশের তরুণ গবেষক ও নীতি নির্ধারকদের জন্য একটি স্পষ্ট দিকনির্দেশনা। সঠিক নীতি, পর্যাপ্ত বিনিয়োগ এবং অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলেই বাংলাদেশের পক্ষে গবেষণা ও উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে বিশ্ব আসরে একটি শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করা সম্ভব হবে, যা দেশের টেকসই উন্নয়নের পথকে প্রশস্ত করবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *