NTRCA’র জাল সনদের অভিযোগ: ১৩৮ শিক্ষককে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ, সনদ পুনঃযাচাইয়ের নির্দেশ
বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ১৩৮ জন শিক্ষকের বিরুদ্ধে বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের (NTRCA) জাল সনদ ব্যবহারের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। প্রাথমিকভাবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর (DIA) এই শিক্ষকদের চিহ্নিত করে তাদের বেতন-ভাতা (MPO) স্থগিত এবং উত্তোলিত অর্থ ফেরত নেওয়ার সুপারিশ করেছিল।
তবে, শিক্ষা মন্ত্রণালয় তাৎক্ষণিকভাবে সেই সুপারিশ বাস্তবায়ন না করে অভিযুক্ত শিক্ষকদের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিয়েছে। মন্ত্রণালয় এই ১৩৮ জন শিক্ষকের নিবন্ধন সনদের সঠিকতা পুনরায় যাচাই করার জন্য NTRCA-কে নির্দেশ দিয়েছে।
ঘটনার প্রেক্ষাপট: যেভাবে অভিযোগ সামনে এলো
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর (DIA) নিয়মিত পরিদর্শনের অংশ হিসেবে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের সনদ যাচাই করে থাকে। সাম্প্রতিক এক যাচাই প্রক্রিয়ায়, বিশেষ করে খুলনা ও রংপুর অঞ্চলের বিভিন্ন বেসরকারি স্কুল, কলেজ ও মাদরাসায় কর্মরত ১৩৮ জন শিক্ষকের NTRCA সনদ নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়।
DIA তাদের প্রাথমিক তদন্তে এই সনদগুলোকে ‘জাল’ বা ‘অবৈধ’ হিসেবে চিহ্নিত করে এবং সে অনুযায়ী শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগে (SHED) প্রতিবেদন জমা দেয়। প্রতিবেদনে DIA অভিযুক্তদের MPO বাতিল, অবৈধভাবে উত্তোলিত বেতন-ভাতা সরকারি কোষাগারে ফেরত নেওয়া এবং তাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দায়েরের সুপারিশ করে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত: পুনঃযাচাইয়ের নির্দেশ
DIA-এর কঠোর সুপারিশ সত্ত্বেও, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ অভিযুক্ত শিক্ষকদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। বরং, বিভাগ থেকে NTRCA-কে একটি চিঠি দিয়ে এই ১৩৮ জন শিক্ষকের সনদ চূড়ান্তভাবে পুনঃযাচাই করার জন্য অনুরোধ করা হয়েছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এই সিদ্ধান্তের অর্থ হলো:
- আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ: অভিযুক্ত শিক্ষকরা NTRCA-এর পুনঃযাচাই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাদের সনদের বৈধতা প্রমাণের একটি সুযোগ পাচ্ছেন।
- MPO স্থগিত নয় (আপাতত): পুনঃযাচাই প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত এবং NTRCA থেকে চূড়ান্ত প্রতিবেদন না পাওয়া পর্যন্ত এই ১৩৮ জন শিক্ষকের MPO স্থগিত করা হচ্ছে না।
পুনঃযাচাই প্রক্রিয়া ও পরবর্তী পদক্ষেপ
NTRCA এখন এই ১৩৮টি সনদের প্রতিটি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করবে। এই যাচাই প্রক্রিয়ার ফলাফলের ওপর ভিত্তি করেই পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে:
- যদি সনদ বৈধ প্রমাণিত হয়: সংশ্লিষ্ট শিক্ষক তার MPO এবং চাকরি ফিরে পাবেন বা বহাল থাকবে।
- যদি সনদ জাল প্রমাণিত হয়:
- NTRCA শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেবে।
- সেই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর (DSHE) উক্ত শিক্ষকের MPO স্থায়ীভাবে বন্ধ করবে।
- DIA অবৈধভাবে উত্তোলিত বেতন-ভাতা আদায়ের জন্য পদক্ষেপ নেবে।
- অভিযুক্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দায়ের করা হবে।
কেন এই পুনঃযাচাই?
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এই পুনঃযাচাইয়ের সিদ্ধান্তকে একটি যৌক্তিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ, DIA-এর প্রাথমিক তদন্তে ভুলত্রুটি থাকার সম্ভাবনা থাকতে পারে। চূড়ান্ত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা (চাকরিচ্যুতি ও অর্থদণ্ড) গ্রহণের আগে সনদের বৈধতা সম্পর্কে শতভাগ নিশ্চিত হওয়া জরুরি। এটি অভিযুক্তদের প্রতি नैसर्गिक বিচার (Natural Justice) নিশ্চিত করার একটি প্রয়াসও বটে।
শেষ কথা
এই ১৩৮ জন শিক্ষকের ভবিষ্যৎ এখন NTRCA-এর পুনঃযাচাই প্রতিবেদনের ওপর নির্ভর করছে। এই ঘটনাটি আবারও প্রমাণ করলো যে, শিক্ষাখাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে সনদ যাচাই প্রক্রিয়া কতটা গুরুত্বপূর্ণ। একইসাথে, এটি জাল সনদ ব্যবহারের বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর অবস্থানেরও ইঙ্গিত দেয়, তবে চূড়ান্ত ব্যবস্থা গ্রহণের আগে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করার নীতিকেও তুলে ধরে।