টেকনোক্র্যাট মন্ত্রী কী ও কেন? বাংলাদেশের সংবিধান এ বিষয়ে যা বলে
বাংলাদেশের নতুন মন্ত্রিসভা গঠনের পর একটি শব্দ নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে বেশ কৌতূহল দেখা দিয়েছে—‘টেকনোক্র্যাট মন্ত্রী’। অনেক সময় দেখা যায়, জাতীয় নির্বাচনে সরাসরি অংশগ্রহণ না করেও বা সংসদ সদস্য (MP) না হয়েও কোনো ব্যক্তি মন্ত্রিসভার সদস্য হিসেবে শপথ নিচ্ছেন।
তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন মন্ত্রিসভাতেও ৩ জন টেকনোক্র্যাট (২ জন পূর্ণ মন্ত্রী ও ১ জন প্রতিমন্ত্রী) নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের সংবিধানের আলোকে এই বিশেষ পদটির আইনি ব্যাখ্যা ও প্রয়োজনীয়তা নিচে তুলে ধরা হলো।
টেকনোক্র্যাট মন্ত্রী বলতে কী বোঝায়?
সহজ ভাষায়, যিনি জাতীয় সংসদের নির্বাচিত সদস্য নন, কিন্তু বিশেষ মেধা, দক্ষতা বা অভিজ্ঞতার কারণে সরকারের অংশ হিসেবে মন্ত্রিসভায় নিয়োগ পান—তাঁকেই টেকনোক্র্যাট মন্ত্রী বলা হয়। তারা রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করেন।
সংবিধানের ৫৬(২) অনুচ্ছেদ ও ১০ শতাংশ কোটা
বাংলাদেশের সংবিধানে সরাসরি ‘টেকনোক্র্যাট’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়নি, তবে অনুচ্ছেদ ৫৬(২)-তে এর আইনি ভিত্তি দেওয়া হয়েছে। সংবিধান অনুযায়ী:
- মন্ত্রিসভার মোট সদস্য সংখ্যার অন্যূন নয়-দশমাংশ (৯০%) অবশ্যই নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের মধ্য থেকে হতে হবে।
- বাকি অনধিক এক-দশমাংশ (১০%) সদস্য এমন ব্যক্তিদের মধ্য থেকে নিয়োগ দেওয়া যাবে, যারা সংসদ সদস্য নন।
- শর্ত: ওই ব্যক্তিকে অবশ্যই সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার যোগ্য হতে হবে (বয়স ২৫ বছর, নাগরিকত্ব এবং অন্যান্য আইনি যোগ্যতা)।
কেন টেকনোক্র্যাট মন্ত্রী নিয়োগ দেওয়া হয়?
সরকার পরিচালনায় শুধুমাত্র রাজনৈতিক প্রজ্ঞাই যথেষ্ট নয়, বরং কারিগরি ও বিশেষজ্ঞ জ্ঞানেরও প্রয়োজন হয়। মূলত ৩টি কারণে এই কোটা ব্যবহার করা হয়:
- বিশেষজ্ঞ জ্ঞান যুক্ত করা: অর্থনীতি, আইন, পররাষ্ট্রনীতি বা তথ্যপ্রযুক্তির মতো বিশেষায়িত মন্ত্রণালয় পরিচালনার জন্য ওই বিষয়ের বিশেষজ্ঞ প্রয়োজন হয়, যিনি হয়তো সরাসরি সক্রিয় রাজনীতিতে নেই।
- মেধার মূল্যায়ন: দলের ভেতরে বা বাইরে থাকা উচ্চশিক্ষিত ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের রাষ্ট্র পরিচালনায় সরাসরি যুক্ত করার সুযোগ তৈরি হয়।
- প্রশাসনিক ভারসাম্য: অনেক সময় জ্যেষ্ঠ কোনো নেতা নির্বাচনে জয়ী হতে না পারলেও তাঁর প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে প্রধানমন্ত্রী এই ক্ষমতা ব্যবহার করেন।
টেকনোক্র্যাট মন্ত্রীদের ক্ষমতা ও সীমাবদ্ধতা
একজন টেকনোক্র্যাট মন্ত্রী অন্যান্য নির্বাচিত মন্ত্রীদের মতোই সমান বেতন, ভাতা ও মর্যাদা পান। তবে তাঁদের একটি বড় সীমাবদ্ধতা রয়েছে:
- সংসদে ভোটদান: সংবিধানের ৭৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, টেকনোক্র্যাট মন্ত্রীরা সংসদে বক্তব্য দিতে পারেন এবং বিতর্কে অংশ নিতে পারেন, কিন্তু সংসদের কোনো বিল বা প্রস্তাবে ভোট দিতে পারেন না।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশে ১৯৯১ সাল থেকে প্রায় প্রতিটি সরকারই টেকনোক্র্যাট কোটা ব্যবহার করেছে। অতীতে শাহ এ এম এস কিবরিয়া (অর্থমন্ত্রী), ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ (আইনমন্ত্রী), স্থপতি ইয়াফেস ওসমান (বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি) এবং মোস্তফা জব্বারের (ডাক ও টেলিযোগাযোগ) মতো ব্যক্তিরা এই কোটায় অত্যন্ত সফলভাবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
FAQ – সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী
প্রশ্ন ১: একজন বিদেশি কি টেকনোক্র্যাট মন্ত্রী হতে পারেন?উত্তর: না। যেহেতু মন্ত্রী হওয়ার পূর্বশর্ত হলো সংসদ সদস্য হওয়ার যোগ্যতা থাকা, তাই অবশ্যই তাঁকে বাংলাদেশের নাগরিক হতে হবে।
প্রশ্ন ২: টেকনোক্র্যাট মন্ত্রী কি প্রধানমন্ত্রীর কাছে দায়ী?উত্তর: হ্যাঁ, তারা সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর কাছে দায়ী থাকেন এবং সামগ্রিকভাবে মন্ত্রিসভার সদস্য হিসেবে সংসদের কাছে দায়বদ্ধ।
প্রশ্ন ৩: কতজন টেকনোক্র্যাট মন্ত্রী হতে পারেন?উত্তর: মন্ত্রিসভার মোট সদস্য যদি ৫০ জন হয়, তবে সর্বোচ্চ ৫ জন টেকনোক্র্যাট মন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ পেতে পারেন।
উপসংহার: আধুনিক রাষ্ট্র পরিচালনায় বিশেষজ্ঞদের ভূমিকা
আধুনিক ও স্মার্ট বাংলাদেশ গড়তে বিশেষজ্ঞ জ্ঞানের কোনো বিকল্প নেই। টেকনোক্র্যাট মন্ত্রী নিয়োগের এই সাংবিধানিক বিধানটি মূলত সরকারে মেধাবীদের অংশগ্রহণের একটি সেতুবন্ধন। এর মাধ্যমে রাজনীতি ও বিশেষজ্ঞ জ্ঞানের সমন্বয় ঘটে, যা শেষ পর্যন্ত দেশের উন্নয়নকেই ত্বরান্বিত করে।