গণভোটের ফল বাতিল চেয়ে হাইকোর্টে রিট: আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে ‘হ্যাঁ’ জয়
বাংলাদেশের সংবিধান সংস্কার এবং ‘জুলাই চার্টার’ বাস্তবায়নের লক্ষে গত ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে দেশজুড়ে অনুষ্ঠিত হয় ঐতিহাসিক গণভোট। তবে এই গণভোটের ফলাফল ঘোষণার চারদিনের মাথায় এর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে উচ্চ আদালতে রিট দায়ের করা হয়েছে। আজ ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এ বি এম আতাউল মজিদ তৌহিদ জনস্বার্থে এই রিটটি দায়ের করেন।
রিট আবেদনটিতে মূলত গণভোটের আইনি ভিত্তি এবং ঘোষিত ফলাফলের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। নিচে এই আইনি চ্যালেঞ্জের প্রেক্ষাপট ও মূল বিষয়গুলো তুলে ধরা হলো।
রিট আবেদনের মূল কারণ ও দাবি
রিট আবেদনকারী আইনজীবীর মতে, এই গণভোট আয়োজনের প্রক্রিয়ায় কিছু সাংবিধানিক ও আইনি ত্রুটি রয়েছে। রিটের প্রধান দিকগুলো হলো:
- বৈধতা চ্যালেঞ্জ: গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত গণভোটের সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াকে অবৈধ ঘোষণার আবেদন জানানো হয়েছে।
- ফলাফল বাতিল: ১৩ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন কমিশন কর্তৃক ঘোষিত ফলাফল (যেখানে ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত হয়েছে) বাতিলের দাবি করা হয়েছে।
- বিবাদী: রিটে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (CEC), মন্ত্রিপরিষদ সচিব এবং আইন সচিবকে বিবাদী করা হয়েছে।
গণভোটের ফলাফল ও বর্তমান প্রেক্ষাপট (এক নজরে)
গত ১৩ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন কমিশন সচিবালয় থেকে গণভোটের চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণা করা হয়েছিল। সেখানে দেখা যায়:
- ভোটের হার: ৬০.২৬ শতাংশ।
- ‘হ্যাঁ’ ভোট: ৪ কোটি ৮০ লাখ ৭৪ হাজার ৪২৯ জন।
- ‘না’ ভোট: ২ কোটি ২৫ লাখ ৬৫ হাজার ৬২৭ জন। নির্বাচন কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, পরিবর্তনের পক্ষে অর্থাৎ ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত হয়েছে, যা নতুন সরকারের জন্য সংবিধান সংস্কারের ম্যান্ডেট হিসেবে বিবেচিত হচ্ছিল।
শুনানির সম্ভাব্য সময়
হাইকোর্ট সূত্রে জানা গেছে, আগামী সপ্তাহে বিচারপতি ফাতেমা নজীবের নেতৃত্বাধীন হাইকোর্ট বেঞ্চে এই রিট আবেদনটির ওপর শুনানি হতে পারে। আদালত রিটটি গ্রহণ করলে গণভোটের ফলাফল বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় স্থগিতাদেশ আসতে পারে কি না, তা নিয়ে এখন সবার নজর উচ্চ আদালতের দিকে।
রাজনৈতিক ও আইনি প্রভাব (বিশ্লেষণ)
এই রিট আবেদনটি নতুন সরকারের জন্য একটি বড় আইনি চ্যালেঞ্জ। কারণ:
- সংবিধান সংস্কার: গণভোটের ফলাফলের ওপর ভিত্তি করেই নতুন সরকার সংবিধানের বড় ধরনের পরিবর্তন (যেমন প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ নির্ধারণ, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য) করার পরিকল্পনা করছে।
- আইনি জটিলতা: যদি আদালত গণভোটের প্রক্রিয়া নিয়ে কোনো প্রশ্ন তোলে, তবে পুরো সংস্কার প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হতে পারে।
- জনস্বার্থ: রিট আবেদনকারী এটিকে ‘জনস্বার্থ’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন, যা সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার ও আইনি প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার একটি অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
FAQ – সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী
প্রশ্ন ১: রিট দায়ের করার মানে কি গণভোট বাতিল হয়ে যাওয়া? উত্তর: না। রিট দায়ের করা মানে আইনি চ্যালেঞ্জ জানানো। আদালত শুনানি শেষে যদি মনে করেন প্রক্রিয়াটি অবৈধ ছিল, তবেই এটি বাতিলের আদেশ আসতে পারে।
প্রশ্ন ২: গণভোটে তো ‘হ্যাঁ’ জয়ী হয়েছে, তবে রিট কেন? উত্তর: অনেক সময় প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, ভোটার উপস্থিতি বা সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা মানা হয়নি—এমন অভিযোগে রিট করা হয়। আবেদনকারীর দাবি, এই গণভোটের আইনি ভিত্তি যথাযথ নয়।
প্রশ্ন ৩: পরবর্তী শুনানি কবে? উত্তর: আগামী সপ্তাহে হাইকোর্টের নির্ধারিত বেঞ্চে এই বিষয়ে প্রাথমিক শুনানি হওয়ার কথা রয়েছে।
উপসংহার: আদালতের রায়ের অপেক্ষায় বাংলাদেশ
গণভোটের মাধ্যমে জনগণ তাদের রায় দিলেও, আইনি মাপকাঠিতে তা কতটা টিকে থাকবে তা এখন উচ্চ আদালতের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণের এই পথে হাইকোর্টের এই শুনানি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।