প্রাথমিকের ভিত্তি মজবুত হলেই উচ্চশিক্ষা সহজ হবে”: শিক্ষা উপদেষ্টার কড়া বার্তা
একটি দেশের শিক্ষাব্যবস্থা একটি বহুতল ভবনের মতো। এর ভিত্তিপ্রস্তর হলো প্রাথমিক শিক্ষা, আর এর শীর্ষ চূড়া হলো উচ্চশিক্ষা। যদি সেই ভিত্তি বা গোড়াতেই দুর্বলতা থেকে যায়, তবে উপরের কাঠামো যতই চাকচিক্যময় হোক না কেন, তা কখনো মজবুত হতে পারে না।
দেশের শিক্ষা খাতের এই মৌলিক সত্যটিই সম্প্রতি আবারও স্মরণ করিয়ে দিলেন অন্তর্বর্তী সরকারের শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. চৌধুরী রফিকুল আবরার। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সাথে এক মতবিনিময় সভায় তিনি সাফ জানিয়েছেন, “প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়ন হলে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ সহজতর হবে।”
কেন প্রাথমিক শিক্ষাই মূল ফোকাস?
শিক্ষা উপদেষ্টা তার বক্তব্যে একটি অকাট্য যুক্তি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, আমরা প্রায়ই উচ্চশিক্ষার মান নিয়ে কথা বলি, কিন্তু ভুলে যাই যে উচ্চশিক্ষায় আসা শিক্ষার্থীরা তাদের ভিত্তি তৈরি করে আসে প্রাথমিক স্তর থেকে।
- ভিত্তি মজবুত করার তাগিদ: ড. আবরার জোর দিয়ে বলেন, শিক্ষার্থীদের যদি প্রাথমিক স্তরেই সঠিকভাবে গড়ে তোলা না যায়, তাদের যদি মৌলিক সাক্ষরতা, গণনা এবং বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়া না যায়, তবে সেই দুর্বল ভিত্তি নিয়ে তারা যখন উচ্চশিক্ষা স্তরে (বিশ্ববিদ্যালয়ে) প্রবেশ করে, তখন তারা খেই হারিয়ে ফেলে।
- গোড়ায় গলদ: প্রাথমিক স্তরের “গোড়ায় গলদ” থাকলে, সেই ঘাটতি উচ্চশিক্ষা পর্যায়ে এসে পূরণ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। এর ফলেই উচ্চশিক্ষায় গিয়ে শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া, খারাপ ফলাফল করা এবং শেষ পর্যন্ত অদক্ষ গ্র্যাজুয়েট হিসেবে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করার মতো ঘটনা ঘটে।
উচ্চশিক্ষাকে ‘সহজ’ করার অর্থ কী?
শিক্ষা উপদেষ্টার “উচ্চশিক্ষা সহজতর হবে” কথাটির একটি গভীর অর্থ রয়েছে। এর মানে এই নয় যে উচ্চশিক্ষার সিলেবাস কমিয়ে দেওয়া হবে। এর প্রকৃত অর্থ হলো:
১. সক্ষমতা বৃদ্ধি: প্রাথমিক স্তর থেকে মানসম্মত শিক্ষা পেয়ে আসা একজন শিক্ষার্থীর জ্ঞান আহরণের ক্ষমতা, জটিল বিষয় বোঝার দক্ষতা এবং বিশ্লেষণ করার প্রবণতা অনেক বেশি থাকে।
২. গবেষণামুখী হওয়া: যার মৌলিক বিষয়গুলো পরিষ্কার, তার পক্ষেই কেবল উচ্চতর গবেষণা ও উদ্ভাবনী কাজে মনোনিবেশ করা সম্ভব।
৩. দ্রুত অভিযোজন: একটি মজবুত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন এবং আধুনিক পাঠ্যক্রমের সাথে খুব দ্রুত নিজেদের মানিয়ে নিতে পারে।
শিক্ষকদের প্রতি বার্তা
ড. চৌধুরী রফিকুল আবরার মূলত প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের উদ্দেশ্যেই এই বার্তা দিয়েছেন। তিনি মনে করিয়ে দেন যে, জাতি গড়ার মূল দায়িত্বটি তাদের কাঁধেই। একজন শিক্ষার্থী ভবিষ্যতে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, গবেষক বা রাষ্ট্রনায়ক—যা-ই হোক না কেন, তার প্রথম হাতেখড়ি হয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কাছেই।
তাই, এই স্তরে কোনো প্রকার অবহেলা বা মানের সাথে আপস করার সুযোগ নেই।
শেষ কথা
শিক্ষা উপদেষ্টার এই বক্তব্যটি দেশের শিক্ষানীতি নির্ধারকদের জন্য একটি স্পষ্ট দিকনির্দেশনা। উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নের জন্য হাজার কোটি টাকার প্রকল্প নেওয়ার আগে, আমাদের নিশ্চিত করতে হবে যে প্রাথমিক স্তরে প্রতিটি শিশু মানসম্মত শিক্ষা পাচ্ছে কিনা। কারণ, আজকের প্রাথমিক স্তরের বিনিয়োগই হবে আগামী দিনের বিশ্বমানের উচ্চশিক্ষার মূল চাবিকাঠি।