প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় অস্থিরতা: বৃত্তি পরীক্ষা ও মেধা যাচাই নিয়ে মামলার নেতিবাচক প্রভাব ও উত্তরণের পথ
বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা বর্তমানে এক অনাকাঙ্ক্ষিত আইনি জটিলতার আবর্তে আটকা পড়েছে। বৃত্তি পরীক্ষা এবং মেধা যাচাই প্রক্রিয়ার বৈধতা ও নিয়মাবলী নিয়ে বিভিন্ন মহলের দায়ের করা মামলা-মোকদ্দমার কারণে থমকে গেছে স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম। শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই আইনি লড়াইয়ের সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে কয়েক লাখ কোমলমতি শিক্ষার্থীর ওপর।
নিচে প্রাথমিক শিক্ষার এই বর্তমান সংকট এবং এর সম্ভাব্য সমাধান নিয়ে একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন তুলে ধরা হলো।
সংকটের মূলে কী? (প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ)
প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা নিয়ে গত কয়েক বছর ধরেই নীতিনির্ধারক ও অভিভাবকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।
- হঠাৎ সিদ্ধান্ত পরিবর্তন: জাতীয় শিক্ষাক্রম অনুযায়ী পরীক্ষা বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও মাঝেমধ্যে পুনরায় পরীক্ষা নেওয়ার ঘোষণা আসায় বিভ্রান্তি তৈরি হয়।
- আইনি চ্যালেঞ্জ: মেধা যাচাইয়ের পদ্ধতি এবং বৃত্তি প্রদানের ক্রাইটেরিয়া নিয়ে অসন্তুষ্ট হয়ে বিভিন্ন পক্ষ আদালতের শরণাপন্ন হয়েছে। যার ফলে বৃত্তি প্রদানের পুরো প্রক্রিয়াটি এখন স্থগিত বা বিলম্বিত হচ্ছে।
শিক্ষা ব্যবস্থায় মামলার নেতিবাচক প্রভাব
মামলা-মোকদ্দমার কারণে প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তার প্রধান দিকগুলো হলো:
- পাঠদানে ব্যাঘাত: আইনি লড়াইয়ের কারণে মাঠ পর্যায়ের শিক্ষা কর্মকর্তাদের মনোযোগ দাপ্তরিক এবং আইনি কাজে ব্যস্ত থাকছে, যার ফলে বিদ্যালয়ে তদারকি ও গুণগত পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে।
- শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ: বৃত্তি পরীক্ষার অনিশ্চয়তা এবং মেধা যাচাই নিয়ে দীর্ঘসূত্রতা শিক্ষার্থীদের মনে অস্থিরতা ও ভয় তৈরি করছে।
- ফলাফল ও বৃত্তি প্রদানে বিলম্ব: সময়মতো মেধা যাচাই না হওয়ায় এবং ফলাফল প্রকাশে আইনি বাধা থাকায় মেধাবী ও অসচ্ছল শিক্ষার্থীরা তাদের প্রাপ্য আর্থিক সহায়তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
মেধা যাচাই পদ্ধতির সংস্কার বনাম মামলা
বিশেষজ্ঞদের মতে, পরীক্ষা কেন্দ্রিক মেধা যাচাইয়ের পরিবর্তে ধারাবাহিক মূল্যায়নের ওপর জোর দেওয়া হয়েছিল নতুন শিক্ষাক্রমে। কিন্তু এই রূপান্তর প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও সমন্বয়ের অভাব থাকায় মামলা বাড়ছে।
- স্বচ্ছতার অভাব: বৃত্তি নির্বাচনের ক্ষেত্রে অনেক সময় রাজনৈতিক প্রভাব বা অনিয়মের অভিযোগ ওঠে, যা মামলা করার পথ প্রশস্ত করে।
- সমন্বয়হীনতা: প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং শিক্ষা বোর্ডের মধ্যে সমন্বিত সিদ্ধান্তের অভাবে নীতিমালায় ফাঁক থেকে যাচ্ছে।
সমস্যা সমাধানে করণীয় (ভ্যালু এডিশন)
এই আইনি জটিলতা থেকে উত্তরণের জন্য শিক্ষাবিদরা কিছু পরামর্শ দিয়েছেন:
- স্থায়ী নীতিমালা: প্রতি বছর নিয়ম পরিবর্তন না করে একটি স্থায়ী এবং আইনগতভাবে শক্তিশালী ‘বৃত্তি নীতিমালা’ প্রণয়ন করতে হবে।
- আদালতের বাইরে নিষ্পত্তি: মন্ত্রণালয়ের উচিত মামলাকারীদের সাথে আলোচনার মাধ্যমে গঠনমূলক সমাধানে পৌঁছানো যাতে শিক্ষার্থীদের সময় নষ্ট না হয়।
- আধুনিক মূল্যায়ন পদ্ধতি: শুধুমাত্র একটি পরীক্ষার ওপর নির্ভর না করে ক্লাসের পারফরম্যান্স ও সৃজনশীলতার ভিত্তিতে মেধা যাচাইয়ের পদ্ধতিকে আইনি কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসা।
FAQ – সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী
প্রশ্ন ১: প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা কি বর্তমানে চালু আছে? উত্তর: বর্তমান শিক্ষাক্রম অনুযায়ী প্রথাগত বৃত্তি পরীক্ষা বন্ধ থাকলেও মেধা যাচাইয়ের বিশেষ প্রক্রিয়ার ওপর আইনি স্থগিতাদেশ ও মামলা থাকায় বিষয়টি এখন মন্ত্রণালয়ের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষায়।
প্রশ্ন ২: মামলাগুলো কেন করা হচ্ছে? উত্তর: মূলত বৃত্তি নির্বাচনের নিয়মাবলী, কোটা পদ্ধতি এবং আকস্মিক নিয়ম পরিবর্তনের কারণে বঞ্চিত বা অসন্তুষ্ট পক্ষগুলো আদালতের দ্বারস্থ হচ্ছে।
প্রশ্ন ৩: এই সমস্যার সমাধান হলে শিক্ষার্থীরা কীভাবে উপকৃত হবে? উত্তর: আইনি জটিলতা কাটলে মেধাবী শিক্ষার্থীরা সময়মতো আর্থিক সুবিধা পাবে এবং বিদ্যালয়ে স্থিতিশীল শিক্ষার পরিবেশ ফিরে আসবে।
উপসংহার: কোমলমতি শিক্ষার্থীদের স্বার্থই হোক অগ্রাধিকার
শিক্ষা ব্যবস্থার যেকোনো বড় পরিবর্তন বা মেধা যাচাই পদ্ধতি অবশ্যই স্বচ্ছ এবং আইনি চ্যালেঞ্জমুক্ত হওয়া উচিত। মামলার কারণে প্রাথমিক শিক্ষার মতো স্পর্শকাতর একটি খাত ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া কোনোভাবেই কাম্য নয়। নীতিনির্ধারকদের উচিত দ্রুত আইনি জটিলতা কাটিয়ে শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক শিক্ষাজীবন নিশ্চিত করা।