বিসিএস পরীক্ষা সংস্কার: ভাইভা নম্বর কমানো ও কোটা বাতিলসহ পিএসসিতে এনসিপি’র ১৫ দফা প্রস্তাব
দেশের সিভিল সার্ভিস বা সরকারি চাকরিতে প্রবেশের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা হলো বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (বিসিএস) পরীক্ষা। এই পরীক্ষা পদ্ধতির স্বচ্ছতা, কার্যকারিতা এবং মেধা-ভিত্তিক নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা প্রশ্ন ও সংস্কারের দাবি চলে আসছে।
জুলাই অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্র ব্যবস্থার সংস্কারের যে দাবি জোরালো হয়েছে, তারই অংশ হিসেবে এবার জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) বিসিএস পরীক্ষা পদ্ধতির আমূল সংস্কারের জন্য ১৫ দফা সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব পেশ করেছে বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) কাছে।
আজ (রোববার) এনসিপি’র একটি প্রতিনিধি দল পিএসসি কর্তৃপক্ষের সাথে সাক্ষাৎ করে আনুষ্ঠানিকভাবে এই প্রস্তাবনা জমা দেয়।
কেন এই সংস্কার প্রস্তাব? (প্রেক্ষাপট)
এনসিপি মনে করে, দেশের প্রশাসনকে মেধাবী, দক্ষ ও জনবান্ধব করতে হলে এর প্রবেশদ্বার অর্থাৎ বিসিএস পরীক্ষা পদ্ধতিতে অবশ্যই সংস্কার আনতে হবে। জুলাই অভ্যুত্থানের মূল চেতনা ছিল বৈষম্যহীন ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা, যার প্রতিফলন সরকারি নিয়োগ প্রক্রিয়াতেও থাকা আবশ্যক।
প্রস্তাবনা জমা দেওয়ার পর এনসিপি নেতারা বলেন, বর্তমান পরীক্ষা পদ্ধতিতে কিছু দুর্বলতা রয়েছে যা মেধার সঠিক মূল্যায়নকে বাধাগ্রস্ত করে এবং পুরো প্রক্রিয়াটিকে দীর্ঘায়িত করে। এই দুর্বলতাগুলো দূর করে একটি যুগোপযোগী, স্বচ্ছ ও কার্যকর নিয়োগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করাই তাদের এই প্রস্তাবনার মূল লক্ষ্য।
এনসিপি’র ১৫ দফার মূল প্রস্তাবগুলো কী কী?
যদিও মোট ১৫টি প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, তবে এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং বহুল আলোচিত বিষয়গুলো হলো:
১. ভাইভা (মৌখিক পরীক্ষা) নম্বর কমানো: বিসিএস পরীক্ষায় ভাইভা বোর্ডের নম্বর একটি বড় ভূমিকা রাখে, যা নিয়ে প্রায়শই বিতর্কের সৃষ্টি হয়। এনসিপি ভাইভার নম্বর কমিয়ে এনে লিখিত পরীক্ষার নম্বরের ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়ার প্রস্তাব করেছে, যাতে মেধার মূল্যায়ন আরও বস্তুনিষ্ঠ হয়। ২. কোটা ব্যবস্থার সংস্কার/বিলুপ্তি: জুলাই অভ্যুত্থানের অন্যতম প্রধান দাবি ছিল কোটা ব্যবস্থার সংস্কার বা বিলুপ্তি। এনসিপি তাদের প্রস্তাবে এই কোটা ব্যবস্থার যৌক্তিক সংস্কার বা বাতিলের সুপারিশ করেছে, যাতে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় মেধার সর্বোচ্চ প্রাধান্য নিশ্চিত হয়। ৩. পরীক্ষা পদ্ধতির আধুনিকায়ন: পুরো পরীক্ষা প্রক্রিয়া (প্রিলিমিনারি, লিখিত, ভাইভা) আরও আধুনিক, বিজ্ঞানসম্মত এবং যুগোপযোগী করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। ৪. সময় কমানো: বিসিএস পরীক্ষার বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ থেকে চূড়ান্ত নিয়োগ পর্যন্ত প্রায় ২-৩ বছর বা তারও বেশি সময় লেগে যায়। এনসিপি এই দীর্ঘসূত্রিতা কমিয়ে এনে পুরো প্রক্রিয়াটি দ্রুততম সময়ে সম্পন্ন করার জন্য সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দিয়েছে। ৫. স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা: নিয়োগ প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং যেকোনো অনিয়মের ক্ষেত্রে পিএসসি’র জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা করার দাবি জানানো হয়েছে।
শেষ কথা
এনসিপি’র এই ১৫ দফা প্রস্তাব বিসিএস পরীক্ষা সংস্কারের চলমান আলোচনাকে নিঃসন্দেহে আরও গতিশীল করবে। দেশের তরুণ প্রজন্ম এবং চাকরিপ্রার্থীরা দীর্ঘদিন ধরেই একটি মেধা-ভিত্তিক ও স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়ার দাবি জানিয়ে আসছে। পিএসসি কর্তৃপক্ষ এখন এই প্রস্তাবগুলো কতটা গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে এবং এর আলোকে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে কিনা, সেদিকেই তাকিয়ে থাকবে সবাই।
এটি শুধু একটি রাজনৈতিক দলের প্রস্তাব নয়, বরং এটি জুলাই অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা পূরণের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপও বটে।