এমপিও আবেদন যেন ‘সোনার হরিণ’! কবে শেষ হবে MEMIS সফটওয়্যারের ভোগান্তি?
বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের কাছে এমপিও (Monthly Pay Order) বা মাসিক বেতন আদেশ প্রাপ্তি একটি কাঙ্ক্ষিত এবং অপরিহার্য বিষয়। এই এমপিওভুক্তির প্রক্রিয়াটিকে সহজ ও গতিশীল করার লক্ষ্যে চালু করা হয়েছিল অনলাইনভিত্তিক ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম বা MEMIS সফটওয়্যার। কিন্তু বাস্তবে এই সফটওয়্যারটিই এখন যেন হাজার হাজার শিক্ষক-কর্মচারীর ভোগান্তির মূল কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত বা পদোন্নতিপ্রাপ্ত শিক্ষকদের এমপিওভুক্তির আবেদন এই সফটওয়্যারের মাধ্যমে বিভিন্ন ধাপে (শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে থানা/উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস, জেলা শিক্ষা অফিস, আঞ্চলিক অফিস হয়ে最终 মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরে) অগ্রসর হওয়ার কথা। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, প্রতিটি ধাপেই আবেদনগুলো অহেতুক আটকে থাকছে মাসের পর মাস, যা ভুক্তভোগীদের চরম আর্থিক ও মানসিক কষ্টের কারণ হচ্ছে।
ভোগান্তির চিত্র: কোথায় আটকে থাকে আবেদন?
শিক্ষকদের অভিযোগ অনুযায়ী, MEMIS সফটওয়্যারে আবেদন সাবমিট করার পর শুরু হয় আসল ভোগান্তি। আবেদনগুলো বিভিন্ন পর্যায়ে দীর্ঘ সময় ধরে পড়ে থাকে:
- থানা/উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস: অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠান থেকে পাঠানো আবেদন দিনের পর দিন বা সপ্তাহের পর সপ্তাহ উপজেলা অফিসেই পড়ে থাকছে, পরবর্তী ধাপে (জেলা) ফরওয়ার্ড করা হচ্ছে না।
- জেলা শিক্ষা অফিস (DEO): উপজেলা থেকে জেলা অফিসে গেলেও একই অবস্থা। এখানেও ফাইল আটকে থাকছে দীর্ঘ সময়।
- আঞ্চলিক অফিস: জেলা থেকে আঞ্চলিক অফিসে আবেদন পৌঁছানোর পরও দ্রুত নিষ্পত্তি হচ্ছে না। মাসের পর মাস পার হয়ে যাচ্ছে শুধু একটি ক্লিকেই।
- অপ্রয়োজনীয় কোয়েরি: অনেক কর্মকর্তা অহেতুক বা অপ্রাসঙ্গিক কোয়েরি (Query) দিয়ে বা সামান্য অজুহাতে আবেদন ফেরত পাঠাচ্ছেন, যা ভোগান্তিকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
- অধিদপ্তরে ধীরগতি: সব ধাপ পেরিয়ে আবেদন অধিদপ্তরে (DSHE) পৌঁছালেও সেখানেও দ্রুত সমাধান মিলছে না।
কেন এই দীর্ঘসূত্রিতা?
ভুক্তভোগী শিক্ষক ও সংশ্লিষ্টরা এই ভোগান্তির পেছনে কয়েকটি কারণকে দায়ী করছেন:
- কর্মকর্তাদের গাফিলতি ও উদাসীনতা: অনেক ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সময়মতো ফাইল প্রসেস করছেন না বা বিষয়টিকে গুরুত্ব দিচ্ছেন না।
- সফটওয়্যারের জটিলতা: কেউ কেউ MEMIS সফটওয়্যারের ডিজাইন বা ব্যবহারিক জটিলতাকেও দায়ী করছেন, যদিও মূল অভিযোগ কর্মকর্তাদের দিকেই।
- অসৎ উদ্দেশ্য (অভিযোগ): কিছু ক্ষেত্রে ফাইল দ্রুত ছাড় করানোর জন্য ‘অনৈতিক সুবিধা’ আদায়ের চেষ্টারও অভিযোগ উঠছে।
- জবাবদিহিতার অভাব: কোন ধাপে কত দিনের মধ্যে ফাইল নিষ্পত্তি করতে হবে, তার কোনো সুস্পষ্ট বাধ্যবাধকতা বা মনিটরিং না থাকায় কর্মকর্তারা জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে থেকে যাচ্ছেন।
পরিণতি: শিক্ষকদের মানবেতর জীবন
এই দীর্ঘসূত্রিতার ফলে newly appointed (নবনিয়োগপ্রাপ্ত) বা promoted (পদোন্নতিপ্রাপ্ত) শিক্ষকরা মাসের পর মাস, এমনকি বছর ধরেও বেতন পাচ্ছেন না। এতে তারা চরম আর্থিক সংকটে পড়ছেন, পরিবার-পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হচ্ছেন। ফাইল কোথায় আটকে আছে, তা জানতে তাদের বারবার বিভিন্ন অফিসে দৌড়াতে হচ্ছে, যা তাদের সময়, অর্থ এবং মানসিক শক্তির অপচয় ঘটাচ্ছে।
কবে মিলবে মুক্তি?
MEMIS সফটওয়্যারটি চালু করা হয়েছিল শিক্ষক-কর্মচারীদের হয়রানি কমানোর জন্য। কিন্তু সেটিই যখন হয়রানির কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তখন প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক এই ভোগান্তির শেষ কোথায়?
ভুক্তভোগীরা এখন মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করছেন। তাদের দাবি, এমপিও আবেদন নিষ্পত্তির প্রতিটি ধাপের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হোক এবং কোনো কর্মকর্তা সেই সময়সীমা লঙ্ঘন করলে তার বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক। একইসাথে, MEMIS সফটওয়্যারটিকে আরও ব্যবহারবান্ধব করারও দাবি জানিয়েছেন তারা।
শুধুমাত্র কার্যকর পদক্ষেপ ও কঠোর মনিটরিংয়ের মাধ্যমেই এই ‘ডিজিটাল ভোগান্তি’ থেকে মুক্তি মিলতে পারে।