বিশ্ববিদ্যালয়

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়: সেশনজট এখন অতীত, শুরু হলো মানোন্নয়নের নতুন অধ্যায়!

“জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়” নামটি শুনলেই একসময় চোখের সামনে ভেসে উঠতো সেশনজট, মানের প্রশ্ন আর লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থীর দীর্ঘশ্বাসের প্রতিচ্ছবি। চার বছরের অনার্স শেষ করতে যেখানে ৬-৭ বছর লেগে যেত, সেখানে সময়মতো কোর্স শেষ করে বের হওয়াটাই ছিল যেন এক যুদ্ধজয়ের মতো।

কিন্তু সেই দিন বদলেছে! কঠোর পরিশ্রম, সঠিক পরিকল্পনা আর দৃঢ় নেতৃত্বের মাধ্যমে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় তার ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অভিশাপ “সেশনজট” থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ মুক্ত করেছে। এটি নিছক কোনো ছোট অর্জন নয়, এটি একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন, যা প্রতিষ্ঠানটির জন্য এক “নতুন অধ্যায়ের সূচনা” করেছে। আর এই পরিবর্তনের নেপথ্যের কারিগর হিসেবে সামনে এসেছেন বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. মশিউর রহমান

বিদায় সেশনজট: এক যুগান্তকারী অর্জন

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক সাফল্যের মুকুটে সবচেয়ে উজ্জ্বল পালক হলো সেশনজট নির্মূল। এখন শিক্ষার্থীরা তাদের ৪ বছরের অনার্স কোর্স ৪ বছরেই এবং ১ বছরের মাস্টার্স কোর্স ১ বছরেই শেষ করতে পারছে। এর ফলে:

  • শিক্ষার্থীদের জীবনের মূল্যবান সময় আর নষ্ট হচ্ছে না।
  • ক্যারিয়ার প্ল্যানিং বা উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে আবেদন করার ক্ষেত্রে তারা আর পিছিয়ে পড়ছে না।
  • অভিভাবকদের ওপর দীর্ঘদিনের আর্থিক ও মানসিক চাপ কমেছে।

এই অর্জন সম্ভব হয়েছে পরীক্ষা গ্রহণ ও ফলাফল প্রকাশের প্রক্রিয়ায় আমূল সংস্কার আনার মাধ্যমে। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার (যেমন OMR), উত্তরপত্র মূল্যায়ন পদ্ধতির বিকেন্দ্রীকরণ এবং প্রশাসনিক সদিচ্ছা—এই সবকিছু মিলেই সেশনজটের দৈত্যকে হার মানানো গেছে।

ফোকাস এখন মানে: নতুন অধ্যায়ের সূচনা

সেশনজট মুক্তিটাই শেষ কথা নয়, বরং এটিই ছিল মানসম্মত উচ্চশিক্ষা নিশ্চিত করার পথে প্রথম ও প্রধান বাধা অপসারণ। উপাচার্য ড. মশিউর রহমান স্পষ্ট করেছেন, সেশনজট দূর করার পর এখন তাদের মূল লক্ষ্য জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মানকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উন্নীত করা

এই লক্ষ্য অর্জনে ইতোমধ্যে বেশ কিছু যুগান্তকারী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে:

  1. কারিকুলাম আধুনিকায়ন: বিশ্ববাজার ও চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের চাহিদা অনুযায়ী সিলেবাসকে ঢেলে সাজানো হচ্ছে। এতে আইসিটি (ICT), সফট স্কিলস, অন্ট্রাপ্রেনিওরশিপ-এর মতো জরুরি বিষয়গুলোকে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে।
  2. মডেল কলেজ প্রতিষ্ঠা: শিক্ষার মানে সমতা আনতে দেশব্যাপী কিছু কলেজকে ‘মডেল কলেজ’ হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
  3. শিক্ষক প্রশিক্ষণ: শিক্ষকদের দক্ষতা বাড়াতে এবং আধুনিক পাঠদান পদ্ধতির সাথে পরিচিত করতে ব্যাপক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে।
  4. গবেষণায় মনোযোগ: বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা সংস্কৃতির বিকাশ এবং মানসম্মত গবেষণা ও প্রকাশনা বৃদ্ধির জন্য বিশেষ প্রণোদনা ও উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।
  5. নিয়মিত সমাবর্তন: শিক্ষার্থীদের অর্জনকে স্বীকৃতি দিতে এবং প্রাতিষ্ঠানিক ঐতিহ্য ধরে রাখতে এখন থেকে নিয়মিত সমাবর্তন আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
  6. গ্র্যাজুয়েটদের কর্মসংস্থান: পাস করা শিক্ষার্থীরা যেন সহজে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করতে পারে, সেজন্য ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া লিংকেজ তৈরির চেষ্টা চলছে।

পরিচয় সংকট কাটিয়ে ওঠার প্রত্যয়

একসময় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে এক ধরনের ‘পরিচয় সংকট’ কাজ করতো। কিন্তু উপাচার্য ড. মশিউর রহমান বিশ্বাস করেন, এই সংস্কারগুলো বাস্তবায়িত হলে সেই সংকট আর থাকবে না। তিনি আগেই বলেছেন, শিক্ষার্থীরা ভবিষ্যতে তাদের এই প্রতিষ্ঠান নিয়ে গর্ববোধ করবে। মানসম্মত শিক্ষা ও সময়োপযোগী ডিগ্রি নিশ্চিত করার মাধ্যমে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় তার হারানো গৌরব পুনরুদ্ধার করতে এবং দেশের সেরা উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাতারে শামিল হতে বদ্ধপরিকর।

শেষ কথা

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ঘুরে দাঁড়ানোর গল্পটি নিঃসন্দেহে অনুপ্রেরণাদায়ক। সেশনজটের অভিশাপ থেকে মুক্তি এবং মানোন্নয়নের পথে যাত্রা—এই দ্বিমুখী প্রচেষ্টা যদি সফল হয়, তবে তা শুধু লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থীর জীবনই বদলে দেবে না, বরং দেশের সামগ্রিক উচ্চশিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়নে এক বিপ্লব ঘটাবে। অধ্যাপক ড. মো. মশিউর রহমানের নেতৃত্বে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় সেই পথেই হাঁটছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *