প্রতিবন্ধী বিদ্যালয় এমপিওভুক্তির জোর দাবি: ৫ দফা নিয়ে রাস্তায় শিক্ষকরা
দেশের সবচেয়ে অবহেলিত জনগোষ্ঠীর মধ্যে অন্যতম হলো প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা। আর তাদের শিক্ষাদানে নিয়োজিত বিশেষায়িত বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষক-কর্মচারীরাও সম্মুখীন হচ্ছেন চরম বঞ্চনার। বছরের পর বছর ধরে বিনা বেতনে বা নামমাত্র সম্মানিতে কাজ করে যাওয়া এই মানুষ গড়ার কারিগররা এবার তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াইয়ে রাজপথে নেমেছেন।
আজ (সোমবার) সকালে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে “বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী বিদ্যালয় সমূহের সংগঠন”-এর ব্যানারে আয়োজিত এক মানববন্ধন থেকে এই শিক্ষকরা তাদের ৫ দফা দাবি তুলে ধরেন এবং পরবর্তীতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে স্মারকলিপি পেশ করেন।
মূল দাবি: সকল প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়কে এমপিওভুক্তি
আন্দোলনরত শিক্ষকদের প্রধান এবং মূল দাবি হলোদেশের সকল স্বীকৃতিপ্রাপ্ত প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়কে অবিলম্বে এমপিওভুক্ত (MPO) করতে হবে। এমপিওভুক্তির অর্থ হলো, এই বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষক-কর্মচারীরা সরকারের কাছ থেকে তাদের বেতনের মূল অংশ ও কিছু ভাতা পাবেন, যা তাদের আর্থিক অনিশ্চয়তা দূর করবে।
শিক্ষকদের পেশ করা সুনির্দিষ্ট ৫ দফা দাবি
মানববন্ধন থেকে সংগঠনটি মোট ৫টি সুনির্দিষ্ট দাবি জানিয়েছে:
১. সকল স্বীকৃতিপ্রাপ্ত প্রতিবন্ধী বিদ্যালয় এমপিওভুক্তকরণ: কোনো বাছবিচার নয়, যে সকল বিদ্যালয় সরকারের স্বীকৃতি পেয়েছে, তার সবগুলোকেই এমপিওভুক্ত করতে হবে। ২. পর্যায়ক্রমে জাতীয়করণ: এমপিওভুক্তির পর এই বিশেষায়িত বিদ্যালয়গুলোকে ধাপে ধাপে জাতীয়করণ করতে হবে, যাতে শিক্ষক-কর্মচারীরা পূর্ণাঙ্গ সরকারি সুযোগ-সুবিধা পান। ৩. সকল প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর জন্য উপবৃত্তি: এই বিদ্যালয়গুলোতে অধ্যয়নরত সকল প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর জন্য মাসিক উপবৃত্তি চালু করতে হবে, যা তাদের শিক্ষা চালিয়ে যেতে সহায়তা করবে। ৪. স্কুল ফিডিং চালু: শিক্ষার্থীদের পুষ্টি চাহিদা পূরণ ও বিদ্যালয়ে ধরে রাখার জন্য স্কুল ফিডিং (দুপুরের খাবার) কর্মসূচি চালু করতে হবে। ৫. প্রতিবন্ধী সুরক্ষা আইন ২০১৩ বাস্তবায়ন: প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন, ২০১৩-এর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে, যেখানে তাদের শিক্ষা ও অন্যান্য অধিকারের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে।
কেন এই দাবিগুলো এত জরুরি?
সংগঠনের নেতারা বলেন, প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়গুলোতে কর্মরত শিক্ষক-কর্মচারীরা দীর্ঘদিন ধরে বিনা বেতনে বা নামমাত্র বেতনে সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। এতে তারা নিজেরা এবং তাদের পরিবার চরম মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
অন্যদিকে, প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার (যেমন: উপবৃত্তি, খাবার) অভাবে অনেক প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ে আসতে পারছে না বা ঝরে পড়ছে। অথচ, এই বিশেষায়িত শিক্ষাই পারে তাদের সমাজের মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনতে। “প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন ২০১৩” থাকা সত্ত্বেও এর সঠিক বাস্তবায়ন না হওয়ায় তারা তাদের সাংবিধানিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
সরকারের প্রতি আহ্বান
মানববন্ধন শেষে শিক্ষক নেতারা শিক্ষা মন্ত্রণালয়, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং অর্থ মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে তাদের দাবি সম্বলিত স্মারকলিপি পেশ করেন। তারা আশা প্রকাশ করেন, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার এই মানবিক দাবিগুলো সহানুভূতির সাথে বিবেচনা করবে এবং দ্রুততম সময়ে তা বাস্তবায়নে পদক্ষেপ নেবে।
শেষ কথা
প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের শিক্ষা ও তাদের শিক্ষকদের জীবন-জীবিকার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং মানবিক। মূলধারার শিক্ষার পাশাপাশি এই বিশেষায়িত শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং শিক্ষকদের অধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী বিদ্যালয় সমূহের সংগঠনের এই ৫ দফা দাবি সেই দায়িত্বেরই প্রতিধ্বনি।