মাদ্রাসা এমপিও নীতিমালা সংশোধন ২০২৬: নতুন প্রজ্ঞাপন জারি ও বিস্তারিত পরিবর্তন
বাংলাদেশের বেসরকারি মাদ্রাসাগুলোর জনবল কাঠামো এবং এমপিও (MPO) নীতিমালায় বিদ্যমান কিছু অসঙ্গতি দূর করতে সরকার অবশেষে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনীর প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। আজ ৮ মার্চ ২০২৬, রবিবার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ থেকে এই ঐতিহাসিক আদেশটি প্রকাশিত হয়। মূলত গত ২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে জারি করা নীতিমালায় যেসব সীমাবদ্ধতা বা অস্পষ্টতা ছিল, মাদ্রাসা শিক্ষক ও কর্মচারী সংগঠনগুলোর দাবির প্রেক্ষিতে সরকার তা পর্যালোচনা করে এই সংশোধনী নিয়ে এসেছে।
নীতিমালায় প্রধান সংশোধনী ও পরিবর্তনসমূহ
নতুন এই প্রজ্ঞাপনে মাদ্রাসা শিক্ষার প্রশাসনিক কাঠামোতে বেশ কিছু যুগান্তকারী পরিবর্তন আনা হয়েছে। সংশোধিত নীতিমালার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো জেনারেল (সাধারণ) শিক্ষকদের প্রশাসনিক পদে দায়িত্ব পালনের সুযোগ। আগের নীতিমালায় মাদ্রাসার সুপারিনটেনডেন্ট, অধ্যক্ষ বা উপাধ্যক্ষ পদে শুধুমাত্র কামিল বা সমমানের ডিগ্রিধারীদের সুযোগ দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল, যার ফলে সাধারণ বিষয়ের শিক্ষকরা এক ধরনের বৈষম্যের শিকার হচ্ছিলেন। নতুন সংশোধনীতে অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে নির্দিষ্ট শর্তসাপেক্ষে জেনারেল শিক্ষকদেরও প্রশাসনিক ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখার পথ প্রশস্ত করা হয়েছে।
বেতন গ্রেড ও পদোন্নতির নতুন নিয়ম
শিক্ষকদের দীর্ঘদিনের একটি বড় দাবি ছিল উচ্চতর গ্রেড এবং পদোন্নতির ক্ষেত্রে দশমিক (Decimal) গণনার জটিলতা নিরসন করা। এবারের প্রজ্ঞাপনে সেই গাণিতিক জটিলতা দূর করে পদোন্নতির প্রক্রিয়াকে আরও সহজতর করা হয়েছে। এছাড়া কামিল ও ফাজিল মাদ্রাসার লাইব্রেরিয়ান এবং ল্যাব অ্যাসিস্ট্যান্ট পদের বেতন কাঠামোতেও ইতিবাচক পরিবর্তন আনা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যেত, যোগ্য থাকা সত্ত্বেও নীতিমালার মারপ্যাঁচে অনেক শিক্ষক বছরের পর বছর একই স্কেলে আটকে থাকতেন; এই সংশোধনীর ফলে তাদের জন্য নতুন গ্রেড পাওয়ার পথ সুগম হলো।
ইবতেদায়ী ও দাখিল স্তরের জনবল কাঠামো
নতুন প্রজ্ঞাপনে ইবতেদায়ী মাদ্রাসার প্রধানদের বেতন বৈষম্য দূর করার একটি স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এখন থেকে ইবতেদায়ী প্রধানরা তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা অনুযায়ী সম্মানজনক গ্রেডে বেতন পাবেন। পাশাপাশি দাখিল মাদ্রাসার কম্পিউটার ল্যাব অপারেটর এবং অফিস সহায়ক পদের সংখ্যা ও নিয়োগের যোগ্যতা পুনঃনির্ধারণ করা হয়েছে, যা তৃণমূল পর্যায়ের মাদ্রাসাগুলোর দাপ্তরিক কাজে গতিশীলতা আনবে বলে আশা করা হচ্ছে।
কেন এই সংশোধনী প্রয়োজন ছিল?
শিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই শিক্ষা ব্যবস্থায় বৈষম্য নিরসনের অঙ্গীকার করেছিলেন। মাদ্রাসা শিক্ষকরা মনে করেন, পূর্বের নীতিমালায় অনেক ক্ষেত্রেই স্কুল ও কলেজের সাথে বৈষম্য বজায় রাখা হয়েছিল। এই সংশোধিত প্রজ্ঞাপনটি সেই ব্যবধান কমিয়ে আনতে সহায়ক হবে। এটি কেবল শিক্ষকদের আর্থিক সুবিধাই নিশ্চিত করবে না, বরং মাদ্রাসার প্রশাসনিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে এবং গুণগত মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে বড় ভূমিকা রাখবে।
উপসংহার: শিক্ষকদের মধ্যে স্বস্তির নিঃশ্বাস
মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের অধীনে থাকা কয়েক হাজার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের লক্ষাধিক শিক্ষক ও কর্মচারী এই প্রজ্ঞাপনের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলেন। নীতিমালার এই সংস্কার সরকারের একটি সময়োপযোগী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে শিক্ষকরা আশা করছেন, প্রজ্ঞাপন জারির পাশাপাশি এর দ্রুত বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা হবে যাতে করে মাঠ পর্যায়ের মাদ্রাসাগুলো এর সুফল ভোগ করতে পারে।