মাদরাসা শিক্ষকদের বেতন বৈষম্য ও নতুন এমপিও নীতিমালা নিয়ে অসন্তোষ: দ্রুত সংশোধনের দাবি
বাংলাদেশের বেসরকারি মাদরাসাগুলোতে কর্মরত কয়েক লক্ষ শিক্ষক-কর্মচারী বর্তমানে এক চরম অনিশ্চয়তা ও অসন্তোষের মধ্য দিয়ে দিন পার করছেন। গত ২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে কারিগরি ও মাদরাসা শিক্ষা বিভাগ কর্তৃক প্রকাশিত ‘বেসরকারি মাদরাসা জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা-২০২৬’ শিক্ষকদের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
শিক্ষকদের মতে, এই নীতিমালা তাদের দীর্ঘদিনের বেতন বৈষম্য দূর করার পরিবর্তে নতুন আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতা সৃষ্টি করেছে। নিচে শিক্ষকদের মূল অভিযোগ ও দাবিসমূহ বিশ্লেষণ করা হলো:
জেনারেল শিক্ষকদের বৈষম্য ও ক্ষোভ
নতুন নীতিমালায় সবচেয়ে বড় আঘাত এসেছে মাদরাসায় কর্মরত জেনারেল (সাধারণ) শিক্ষকদের ওপর। বাংলাদেশ মাদরাসা জেনারেল টিচার্স এসোসিয়েশনের অভিযোগ অনুযায়ী:
- প্রশাসনিক পদে বাধা: মাদরাসার সুপার, প্রিন্সিপাল বা ভাইস-প্রিন্সিপাল পদে জেনারেল শিক্ষকদের নিয়োগের কোনো সুযোগ রাখা হয়নি। এমনকি তারা ‘ভারপ্রাপ্ত’ হিসেবেও দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না।
- পদোন্নতি জট: সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রে দশমিকের হিসাব নিয়ে জটিলতা থাকায় অনেক শিক্ষক প্রাপ্য পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
বেতন ও ভাতা সংক্রান্ত মূল দাবিসমূহ
মাদরাসা শিক্ষক-কর্মচারীরা দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে বৈষম্যের শিকার দাবি করে তাদের প্রধান তিনটি আর্থিক দাবির কথা আবারও সামনে এনেছেন:
- শতভাগ উৎসব ভাতা: বর্তমানে শিক্ষকরা মূল বেতনের ২৫% এবং কর্মচারীরা ৫০% উৎসব ভাতা পান। আসন্ন ঈদুল ফিতর থেকেই তারা শতভাগ উৎসব ভাতা বা বোনাস প্রদানের দাবি জানিয়েছেন।
- বাড়ি ভাড়া ও চিকিৎসা ভাতা: মূল বেতনের ১৫% বাড়ি ভাড়া (বর্তমানে পর্যায়ক্রমে বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত থাকলেও শিক্ষকরা ২০% দাবি করছেন) এবং ১৫০০ টাকা চিকিৎসা ভাতার দাবি তোলা হয়েছে।
- স্বতন্ত্র বেতন কাঠামো: শিক্ষকদের জন্য একটি পৃথক এবং স্বতন্ত্র বেতন কাঠামো তৈরি করার দাবি দীর্ঘদিনের।
পদের সংখ্যা হ্রাস নিয়ে দুশ্চিন্তা
নীতিমালায় আলিম, ফাজিল ও কামিল মাদরাসায় বিদ্যমান বেশ কিছু পদের সংখ্যা কমিয়ে ফেলা হয়েছে। এর ফলে কর্মরত শিক্ষকদের চাকরির নিরাপত্তা এবং নতুনদের নিয়োগের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়েছে। শিক্ষকরা ইতিমধ্যে এই বিষয়ে মাদরাসা শিক্ষা অধিদপ্তরে লিখিত আবেদন জমা দিয়েছেন।
সরকারের প্রতি শিক্ষকদের আহ্বান
নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের কাছে শিক্ষকদের বিশেষ অনুরোধ:
- নীতিমালা সংশোধন: ২ ফেব্রুয়ারি জারিকৃত নীতিমালা দ্রুত পর্যালোচনা করে বৈষম্যমূলক ধারাগুলো বাতিল করা।
- জাতীয়করণ: বৈষম্য নিরসনের স্থায়ী সমাধান হিসেবে শিক্ষা ব্যবস্থা জাতীয়করণের রোডম্যাপ ঘোষণা করা।
- বদলি ব্যবস্থা: স্কুল-কলেজের মতো মাদরাসা শিক্ষকদের জন্যও দ্রুত এনটিআরসিএ-র মাধ্যমে অনলাইন বদলি ব্যবস্থা কার্যকর করা।
FAQ – সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী
প্রশ্ন ১: নতুন নীতিমালা কি কার্যকর হয়েছে? উত্তর: হ্যাঁ, ২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ থেকে এটি কার্যকর করা হয়েছে। তবে শিক্ষকদের আপত্তির মুখে মন্ত্রণালয় কিছু ধারা সংশোধনের জন্য বৈঠক করছে।
প্রশ্ন ২: ইবতেদায়ী প্রধানদের বেতন কি বেড়েছে? উত্তর: ইবতেদায়ী প্রধানদের ১১তম গ্রেডে বেতন দেওয়ার নির্দেশনা থাকলেও অনেক জায়গায় তা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি, যা শিক্ষকদের অসন্তোষের অন্যতম কারণ।
প্রশ্ন ৩: আসন্ন ঈদে কি শিক্ষকরা শতভাগ বোনাস পাবেন? উত্তর: শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র আভাস দিয়েছে যে, রমজানের ঈদ থেকে শতভাগ উৎসব ভাতা প্রদানের বিষয়টি সরকারের বিবেচনাধীন রয়েছে।
উপসংহার: শিক্ষার মানোন্নয়নে শিক্ষকদের সন্তুষ্টি জরুরি
মাদরাসা শিক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং শিক্ষার্থীদের সঠিক পাঠদান নিশ্চিত করতে শিক্ষকদের আর্থিক ও মানসিক সন্তুষ্টি অপরিহার্য। আশা করা যাচ্ছে, নবনিযুক্ত শিক্ষা প্রশাসন শিক্ষকদের এই যৌক্তিক দাবিগুলো আমলে নিয়ে দ্রুত একটি গ্রহণযোগ্য সমাধান প্রদান করবে।